
ডক্টর ইউনুসের দৃষ্টিতে পরিবর্তন ও নেতৃত্বনোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক ব্যবসার একজন পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। তার দর্শন কেবল অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে। তার 'চেঞ্জ' এবং 'কমান্ড' বিষয়ক ধারণা প্রচলিত গতানুগতিক ধ্যানধারণা থেকে বেশ ভিন্ন এবং একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের প্রতি তার অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটায়।পরিবর্তনের চালিকাশক্তি: উদ্ভাবন ও অংশগ্রহণডক্টর ইউনুস মনে করেন, যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো উদ্ভাবন এবং সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ। তিনি বিশ্বাস করেন যে সমাজের প্রতিটি মানুষের মধ্যে সুপ্ত সম্ভাবনা রয়েছে এবং সুযোগ তৈরি করে দিলে তারা নিজেরাই নিজেদের জীবনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম। গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে তিনি এই বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন, যেখানে প্রান্তিক নারীরা ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং তাদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।তার মতে, চাপিয়ে দেওয়া পরিবর্তন কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। সত্যিকারের পরিবর্তন আসে যখন মানুষ নিজেরাই সেই পরিবর্তনের অংশীদার হয় এবং এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তিনি এমন একটি পরিবেশ তৈরির কথা বলেন যেখানে নতুন আইডিয়া এবং সৃজনশীল সমাধান উৎসাহিত করা হয় এবং যেখানে সমাজের দুর্বলতম অংশের কণ্ঠস্বরও গুরুত্ব পায়।কর্তৃত্বের নতুন সংজ্ঞা: সহযোগিতা ও ক্ষমতায়নডক্টর ইউনুস 'কমান্ড' বা কর্তৃত্বকে पारंपरिक hierarchical কাঠামোর মধ্যে দেখেন না। তার দর্শনে কর্তৃত্বের অর্থ হলো একটি সহযোগী এবং ক্ষমতায়নমূলক নেতৃত্ব। একজন সত্যিকারের নেতা সেই ব্যক্তি যিনি অন্যদের সক্ষম করে তোলেন, তাদের সম্ভাবনা বিকাশে সাহায্য করেন এবং সম্মিলিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেন।তিনি এমন এক ধরনের নেতৃত্বের কথা বলেন যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সকলের অংশগ্রহণ থাকে এবং যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। তার সামাজিক ব্যবসার মডেলে, কর্মীদের এবং সুবিধাভোগীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করা হয়। এখানে 'কমান্ড' কঠোর নির্দেশনার পরিবর্তে একটি साझा vision তৈরি এবং সকলের মধ্যে সমন্বয় সাধনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে।পরিবর্তন ও নেতৃত্বের আন্তঃসম্পর্কডক্টর ইউনুসের দর্শনে পরিবর্তন এবং নেতৃত্ব একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িত। একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন এমন এক ধরনের নেতৃত্বের যা উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে, সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করে। অন্যদিকে, একটি কার্যকর নেতৃত্ব তখনই সম্ভব যখন তা পরিবর্তনের জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং নতুন পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।তিনি মনে করেন, নেতৃত্ব দেওয়া মানে অন্যদের পথ দেখানো নয়, বরং তাদের পাশে থেকে তাদের সক্ষম করে তোলা। একজন নেতা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং সম্মিলিতভাবে একটি উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।উপসংহারডক্টর মুহাম্মদ ইউনুসের 'চেঞ্জ' এবং 'কমান্ড' বিষয়ক ধারণা একটি মানবকেন্দ্রিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের বার্তা দেয়। তিনি মনে করেন, পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়, বরং এটি উদ্ভাবন, অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতায়নের মাধ্যমে অর্জিত হয়। অন্যদিকে, কর্তৃত্ব হলো সহযোগিতা, সমন্বয় এবং সকলের সম্ভাবনা বিকাশের একটি প্রক্রিয়া। তার এই দর্শন বিশ্বব্যাপী সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।আশা করি এই আলোচনা আপনার জন্য সহায়ক হবে। যদি আপনার আরও কিছু জানার থাকে, তবে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।



No comments:
Post a Comment